কিডনিতে পাথর কেন হয়: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায়

কিডনিতে পাথর (Kidney Stone) একটি সাধারণ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি মূলত অতিরিক্ত খনিজ ও লবণের জমাট বাঁধার ফলে কিডনিতে কঠিন স্ফটিক তৈরি হওয়ার কারণে হয়। কিডনির পাথর ছোট হলে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যেতে পারে, তবে বড় হলে এটি মারাত্মক ব্যথা ও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এই ব্লগে আমরা জানব, কিডনিতে পাথর কেন হয়, এর লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ এবং প্রতিরোধের উপায়।

কিডনিতে পাথর কেন হয়?

কিডনির পাথর সাধারণত বিভিন্ন খনিজ পদার্থ ও লবণের জমাট বাঁধার কারণে তৈরি হয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

১. পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া (ডিহাইড্রেশন)

  • কম পানি পান করলে প্রস্রাব ঘন হয়ে যায়, ফলে অতিরিক্ত খনিজ ও লবণ জমে পাথর তৈরি হয়।
  • দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা জরুরি।

    raju akon youtube channel subscribtion

২. অতিরিক্ত সোডিয়াম (লবণ) গ্রহণ

  • বেশি লবণ খেলে কিডনি ক্যালসিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করতে পারে না, ফলে পাথর জমতে শুরু করে।
  • প্রসেসড ফুড ও অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

৩. উচ্চ অক্সালেটযুক্ত খাবার খাওয়া

  • কিছু খাবারে অক্সালেট বেশি থাকে, যা ক্যালসিয়ামের সাথে মিশে পাথর তৈরি করে।
  • অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার: পালং শাক, বিট, চকোলেট, বাদাম, চা।

৪. বেশি পরিমাণে প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণ

  • অতিরিক্ত মাংস, ডিম, এবং সামুদ্রিক খাবার খেলে প্রস্রাবের অ্যাসিডিটি বেড়ে যায়, যা পাথর তৈরিতে সহায়তা করে।

৫. ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা

  • কম ক্যালসিয়াম: অনেকেই মনে করেন, ক্যালসিয়াম কম খেলে পাথর হবে না, কিন্তু এটি ভুল ধারণা।
  • বেশি ক্যালসিয়াম: অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বের হয়ে পাথর তৈরি করতে পারে।

৬. পারিবারিক ইতিহাস ও জেনেটিক কারণ

  • যদি পরিবারের কারও কিডনিতে পাথর হয়ে থাকে, তাহলে আপনার ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।

৭. স্থূলতা ও অনিয়মিত জীবনযাপন

  • অতিরিক্ত ওজন ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে, যা পাথর তৈরির কারণ হতে পারে।

কিডনিতে পাথরের লক্ষণ

কিডনিতে পাথর হলে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে:

তীব্র পিঠ বা কোমরের ব্যথা (Kidney Stone Pain)।
প্রস্রাবে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া অনুভব করা।
প্রস্রাবে রক্ত আসা (লালচে বা বাদামি প্রস্রাব)।
বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া।
প্রস্রাবের গন্ধ পরিবর্তন হওয়া বা ঘন প্রস্রাব হওয়া।
জ্বর ও ঠান্ডা লাগা (যদি সংক্রমণ হয়)।

কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের উপায়

১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন

  • প্রতিদিন ৮-১২ গ্লাস পানি পান করুন।
  • ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে ডাবের পানি ও লেবুর শরবত উপকারী।

২. লবণ ও প্রসেসড ফুড কম খান

  • অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার (ফাস্ট ফুড, চিপস, প্যাকেটজাত খাবার) এড়িয়ে চলুন।
  • প্রতিদিন ৫ গ্রাম (১ চা চামচ) লবণের বেশি না খাওয়ার চেষ্টা করুন

৩. অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার পরিমিত পরিমাণে খান

  • পালং শাক, চকোলেট, চা, বাদাম কম খান।
  • অক্সালেটযুক্ত খাবারের সাথে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ করুন, যাতে ক্যালসিয়াম প্রস্রাবের পরিবর্তে অন্ত্রে শোষিত হয়।

৪. প্রাণিজ প্রোটিন কম খান

  • প্রতিদিন ৭০-১০০ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করুন।
  • অতিরিক্ত মাংস, ডিম, ও সামুদ্রিক খাবার খেলে প্রস্রাবের অ্যাসিডিটি বেড়ে যায়, যা পাথর তৈরি করতে পারে।

৫. লেবু ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান

  • লেবুর রস কিডনির পাথর গলাতে সাহায্য করে।
  • কমলালেবু, আনারস, স্ট্রবেরি, এবং আমলকি উপকারী।

৬. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করুন।
  • স্থূলতা কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যা পাথর তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।

৭. কিডনির স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

  • যদি প্রস্রাবে ব্যথা, রক্ত, বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কিডনিতে পাথর হলে করণীয়

  • প্রচুর পানি পান করুন যাতে ছোট পাথর প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করুন।
  • যদি পাথর বড় হয় (৫ মিমি-এর বেশি), তাহলে শকওয়েভ থেরাপি (ESWL) বা সার্জারি লাগতে পারে।

উপসংহার

কিডনিতে পাথর একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত পানি পান করার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। যদি আপনি কিডনির পাথরের ঝুঁকিতে থাকেন, তবে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অনুসরণ করুন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। আপনার যদি কোনো অভিজ্ঞতা বা পরামর্শ থাকে, তাহলে মন্তব্য করে জানাতে পারেন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top