বাচ্চাদের খিচুনি (Seizure) একটি গুরুতর স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যা অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হতে পারে। এটি মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের ফলে ঘটে এবং বিভিন্ন কারণে দেখা দিতে পারে। যদি শিশু আকস্মিকভাবে অজ্ঞান হয়ে যায়, শরীর কাঁপতে থাকে বা অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলন করে, তাহলে এটি খিচুনির লক্ষণ হতে পারে। এই ব্লগে, আমরা বাচ্চাদের খিচুনির লক্ষণ, কারণ ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বাচ্চাদের খিচুনির সাধারণ লক্ষণ
খিচুনির ধরণ ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত নিচের লক্ষণগুলো দেখা যায়:
- শরীরের কাঁপুনি ও অনিয়ন্ত্রিত ঝাঁকি – শিশুর শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশ বা পুরো শরীর কাঁপতে পারে।
- হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া – খিচুনির সময় শিশু কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের জন্য সংজ্ঞাহীন হতে পারে।
- চোখ উপরের দিকে উঠে যাওয়া – চোখ ঘুরে যেতে পারে বা স্থির হয়ে যেতে পারে।
- অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস – খিচুনির সময় শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস অনিয়মিত হতে পারে।
- মুখ ও ঠোঁট নীলচে হওয়া – পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ না পাওয়ার ফলে এমন হতে পারে।
- হঠাৎ শক্ত বা দুর্বল হয়ে যাওয়া – কিছু শিশুর খিচুনির সময় শরীর শক্ত হয়ে যায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে।
- অপ্রয়োজনীয় শব্দ বা কান্না – খিচুনির আগে বা পরে শিশু অপ্রত্যাশিতভাবে চিৎকার বা কান্না করতে পারে।
- জ্ঞান ফিরে আসার পর বিভ্রান্তি – খিচুনির পরে শিশুরা কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত ও দুর্বল অনুভব করতে পারে।
খিচুনি হওয়ার সম্ভাব্য কারণ
বাচ্চাদের খিচুনির বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যেমন:
- জ্বরজনিত খিচুনি (Febrile Seizure) – সাধারণত উচ্চ মাত্রার জ্বরের কারণে ঘটে, যা ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
- মস্তিষ্কে ইনফেকশন – মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস বা অন্য কোনো সংক্রমণের কারণে হতে পারে।
- জেনেটিক বা বংশগত কারণ – পারিবারিক ইতিহাস থাকলে শিশুদের খিচুনি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- নিউরোলজিক্যাল সমস্যা – মস্তিষ্কের গঠনের ত্রুটি বা অন্য কোনো নিউরোলজিক্যাল অসুস্থতা।
- ট্রমা বা মাথায় আঘাত – শিশুদের মাথায় আঘাত লাগলে খিচুনি হতে পারে।
- রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া (Hypoglycemia) – শিশুদের রক্তে শর্করার মাত্রা খুব কমে গেলে খিচুনি হতে পারে।
- অক্সিজেন স্বল্পতা (Hypoxia) – প্রসবকালীন সময়ে শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেন স্বল্পতা থাকলে পরবর্তীতে খিচুনি হতে পারে।
খিচুনি হলে কী করণীয়?
যদি আপনার শিশু খিচুনি শুরু করে, তাহলে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:
- শিশুকে নিরাপদ স্থানে রাখুন – মেঝেতে বা নরম জায়গায় রাখুন, যাতে পড়ে গিয়ে আঘাত না পায়।
- শিশুকে পাশ ফিরিয়ে দিন – শ্বাসনালি পরিষ্কার রাখতে শিশুর মাথা এক পাশে করুন, যাতে লালা বা বমি বের হয়ে যেতে পারে।
- শিশুর মুখে কিছু দেবেন না – মুখে পানি, খাবার বা অন্য কিছু দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- সময় নোট করুন – খিচুনি কতক্ষণ স্থায়ী হয় তা লক্ষ্য করুন, কারণ চিকিৎসকের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে।
- কাপড় ঢিলা করুন – শিশুর জামা-কাপড় বেশি টাইট থাকলে তা ঢিলা করুন, যেন শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকে।
- শিশুর পাশে থাকুন – খিচুনি শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ শিশুর পাশে থাকুন এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিশ্চিত করুন।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যদি নিচের পরিস্থিতি দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
- খিচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়।
- শিশুর খিচুনির সময় শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।
- খিচুনির পরেও শিশুর জ্ঞান ফেরে না।
- একই দিনে একাধিকবার খিচুনি হয়।
- শিশুর খিচুনি প্রথমবার হয়েছে এবং এর কোনো পূর্ববর্তী ইতিহাস নেই।
খিচুনির প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা
খিচুনি প্রতিরোধের জন্য কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে:
- শিশুর জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখা – জ্বর হলে দ্রুত ওষুধ দিন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করান।
- পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করুন – সুষম খাদ্য শিশুর সুস্থ বিকাশে সাহায্য করে এবং খিচুনির ঝুঁকি কমায়।
- মাথায় আঘাত লাগার ঝুঁকি কমান – বাচ্চাদের নিরাপদ পরিবেশে রাখুন, যেন তারা মাথায় আঘাত না পায়।
- নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন – শিশু যদি খিচুনির ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার
বাচ্চাদের খিচুনি একটি গুরুতর সমস্যা হতে পারে, তবে সঠিক পরিচর্যা ও সচেতনতা থাকলে এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। খিচুনির লক্ষণ সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার শিশু খিচুনির শিকার হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।