প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি নিজেদের পরিবারকে—বিশেষত বউ এবং বাচ্চাদের—দেশে রেখে আসেন। এই পরিস্থিতি অনেক সময় একধরনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং একাকীত্ব সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদীভাবে পরিবার থেকে দূরে থাকা একজন ব্যক্তির জন্য মানসিকভাবে কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, তা অনেক সময় পরিস্কারভাবে অনুভূত হয় না। কিন্তু এক্ষেত্রে যেহেতু বাচ্চা এবং বউকে নিজের সঙ্গে রাখতে না পারা, এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের ব্লগে, আমরা আলোচনা করব বউ-বাচ্চাকে বাংলাদেশে রেখে আসার মানসিক প্রভাব এবং সেই প্রভাবের মোকাবিলা করার উপায়।
বউ-বাচ্চাকে বাংলাদেশে রেখে আসার মানসিক প্রভাব
১. একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি
একটি বড় মানসিক চ্যালেঞ্জ হলো একাকীত্ব। প্রবাসে গিয়ে একা থাকার ফলে আপনি অনেক সময় পরিবার, বন্ধু বা পরিচিতদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যখন আপনার বাচ্চা এবং বউ আপনার পাশে থাকে না, তখন আপনার মনে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। বিশেষত, জন্মদিন, ছুটির দিন বা পারিবারিক কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোর সময় এই অনুভূতি তীব্র হতে পারে।
মানসিক প্রভাব:
একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদীভাবে একা থাকার কারণে বিষণ্ণতা এবং শারীরিক ও মানসিক অবসাদ তৈরি হতে পারে। সামাজিক সম্পর্কের অভাব এবং পরিবারের কাছ থেকে শারীরিক সমর্থন না পাওয়ার কারণে এই একাকীত্ব আরও গভীর হতে পারে।
২. পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব
বাচ্চা এবং বউকে দেশে রেখে আসলে, সম্পর্কের মধ্যে সময় এবং যোগাযোগের অভাব দেখা দেয়। প্রাথমিকভাবে, আপনি কাজ এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু যখনই আপনি সময়ের সাথে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখেন, তখন সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা চলে আসে। পারস্পরিক ভালোবাসা এবং অনুভূতি প্রভাবিত হতে পারে, এবং এর ফলে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা হুমকির সম্মুখীন হয়।
মানসিক প্রভাব:
দীর্ঘ সময়ের জন্য একে অপরকে না দেখলে সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব হতে পারে। মানসিকভাবে, এটি দম্পতির মধ্যে দ্যুতি বা কাছাকাছি থাকার অনুভূতি কমিয়ে দিতে পারে, যার কারণে একে অপরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে।
৩. পারিবারিক দায়িত্বের চাপ
একদিকে, প্রবাসে গিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি চাপ থাকে, এবং অন্যদিকে, পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারার দায়বদ্ধতা থাকে। আপনি যতই তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন, ততই এই দায়িত্বের চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে, যদি আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনাদের থেকে টাকা বা অন্য কিছু সহায়তা চায়, তবে আপনি মানসিকভাবে আরো চাপ অনুভব করতে পারেন।
মানসিক প্রভাব:
এই চাপ এবং উদ্বেগ আপনাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত এবং অসন্তুষ্ট করতে পারে। অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার জন্য চাপ আপনার মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় এর কারণে মনোযোগ এবং শারীরিক সুস্থতায় সমস্যার সৃষ্টি হয়।
৪. পরিবারের অভাব এবং সামাজিক সমর্থন
পরিবার থেকে দূরে থাকার ফলে আপনি যে ধরনের মানসিক সমর্থন পাওয়ার আশা করেন, তা প্রায়শই আপনি মিস করবেন। বিশেষত, দেশে থাকাকালীন আপনার পরিবার আপনাকে মানসিকভাবে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু প্রবাসে, একা থাকার কারণে সেই সমর্থন না পাওয়ার অনুভূতি দমিয়ে রাখতে পারেন না।
মানসিক প্রভাব:
সামাজিক এবং পারিবারিক সমর্থন না থাকার কারণে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। এটি আপনি কখনও কখনও অনুভব করতে পারেন যে, আপনি একা, অবহেলিত এবং হতাশ। পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে একটি ফাঁক সৃষ্টি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে আপনার মানসিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
৫. পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব
পরিবারকে দেশে রেখে আসলে, তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কঠিন হতে পারে। কাজের ব্যস্ততা, ভ্রমণ এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার জন্য সময়ের অভাব আপনার এবং আপনার পরিবারের মধ্যে যোগাযোগের গ্যাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মানসিক প্রভাব:
কম যোগাযোগ এবং সম্পর্কের অভাব মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। এটি আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক শান্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত যখন আপনি আপনার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
মোকাবিলার উপায়
১. নিয়মিত যোগাযোগ রাখা
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। ভিডিও কল, ফোন, মেসেজ ইত্যাদির মাধ্যমে আপনার পরিবারের সাথে কথা বলুন। এতে আপনি তাদের সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকতে পারবেন এবং একাকীত্বের অনুভূতি কমাতে সাহায্য করবে।
কীভাবে করবেন:
- পরিবারের সাথে সপ্তাহে এক বা দুই বার ভিডিও কল করুন।
- তাদের ছোট ছোট ঘটনা বা অনুভূতি শেয়ার করুন, যাতে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে থাকলেও অনুভব করতে পারে যে আপনি তাদের পাশে আছেন।
২. পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ দেওয়া
আপনার বাচ্চা এবং বউকে যতটা সম্ভব মনোযোগ দিন। আপনি ব্যস্ত থাকলেও, তাদের প্রতি একগুচ্ছ সময় এবং ভালোবাসা প্রদান করুন। তাদেরকে জানান যে, আপনি তাদের যত্ন নিচ্ছেন এবং সম্পর্কের প্রতি আপনিও দায়বদ্ধ।
কীভাবে করবেন:
- পরিবারের প্রতি আপনার ভালোবাসা এবং সহানুভূতি প্রকাশ করুন।
- প্রতিদিনের কাজের মধ্যেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অনুভূতি শেয়ার করুন।
৩. নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা
একাকীত্ব এবং মানসিক চাপের মোকাবিলায় নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া, আপনার শখের প্রতি মনোযোগ দিন এবং একে অপরকে প্রাধান্য দিন।
কীভাবে করবেন:
- দৈনিক কিছু সময় শারীরিক বা মানসিক প্রশান্তি পেতে ব্যায়াম করুন।
- মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম মাধ্যমে মানসিক শান্তি বজায় রাখুন।
৪. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং সহায়তা
পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করার জন্য একটি সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করুন। এটি আপনাকে চাপ কমাতে এবং পরিবারের জন্য সঠিকভাবে অর্থের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করবে।
কীভাবে করবেন:
- আপনার আয় এবং খরচের একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন।
- পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ পাঠানো এবং সঞ্চয় করা সহজ হবে।
৫. পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করা
যদি আপনি অনুভব করেন যে, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ খুব বেশি হয়ে গেছে, তবে একজন সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিতে পারেন। তারা আপনাকে মানসিক চাপ কমানোর উপায় এবং সম্পর্কের মধ্যে গ্যাপ পূরণের জন্য গাইডলাইন দিতে পারেন।
কীভাবে করবেন:
- কাউন্সেলিং সেশনে অংশগ্রহণ করুন।
- নিজের অনুভূতিগুলি শেয়ার করার জন্য পেশাদার সাহায্য গ্রহণ করুন।
প্রবাসে পরিবার ছাড়া থাকা একটি মানসিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তবে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলি মোকাবিলা করা সম্ভব। নিয়মিত যোগাযোগ, পরিবার এবং সম্পর্কের প্রতি মনোযোগ, মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, এবং পেশাদার সহায়তা গ্রহণের মাধ্যমে আপনি এই মানসিক কষ্ট কমাতে পারবেন এবং সুস্থ, সুখী জীবন কাটাতে পারবেন।
অনলাইনে কাউন্সেলিং সেবার জন্য আমার ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করুন: rajuakon.com/contact
