দুবাইতে বাংলাদেশিদের পরকীয়া বেশি কেন? মানসিক বিশ্লেষণ

দুবাই, UAE-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন, এবং এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী জনগণও এক বড় অংশ। সেখানে, বিশেষ করে প্রবাসী দম্পতিদের মধ্যে পরকীয়া একটি বিষয় যা অনেক সময় আলোচিত হয়। দুবাইয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পরকীয়া বেশি হওয়ার কারণগুলি বেশ জটিল এবং একাধিক মানসিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। আজকের ব্লগে, আমরা আলোচনা করব দুবাইতে বাংলাদেশিদের পরকীয়া বেশি কেন, এবং এর মানসিক বিশ্লেষণ

দুবাইতে বাংলাদেশিদের মধ্যে পরকীয়ার কারণ

১. দূরত্ব এবং একাকীত্ব

দুবাইতে কাজের জন্য আসা অনেক বাংলাদেশি তাদের পরিবারের থেকে অনেক দূরে থাকেন। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্ব এক বড় কারণ হতে পারে। যখন মানুষ দীর্ঘ সময় পরিবার বা প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকে, তখন তাদের মানসিক অবস্থা নড়বড়ে হতে পারে এবং তারা শারীরিক বা মানসিকভাবে অন্য কোনো সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।

raju akon youtube channel subscribtion

মানসিক বিশ্লেষণ:
একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘসময় একা থাকার কারণে ব্যক্তির অনুভূতি, আবেগ এবং চাহিদা অবচেতনে পূর্ণ করতে অন্য সম্পর্কের দিকে চলে যেতে পারে। একে বলা হয় এমোশনাল ফুডিং—যখন কেউ তার মনের অভ্যন্তরীণ শূন্যতা পূর্ণ করার জন্য অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করে।

২. আর্থিক চাপ এবং নৈতিক অবক্ষয়

দুবাইতে উচ্চ জীবনযাত্রার খরচ এবং অর্থ উপার্জনের তাগিদ অনেক প্রবাসীকে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করে। এই আর্থিক চাপ অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা এবং সম্পর্কের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময়, এই চাপ এবং অবসাদ পরকীয়ায় যুক্ত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ কিছু মানুষ সম্পর্কের বাইরে অনুভূতি বা সান্ত্বনা খুঁজে পেতে চায়।

মানসিক বিশ্লেষণ:
অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সঞ্চয়ের চাপে মনের মধ্যে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ দোলাচল সৃষ্টি হয়, যার ফলে পরকীয়ার দিকে ঝুঁকে পড়া সম্ভব হতে পারে। এই চাপ এবং অবসাদ যখন উপেক্ষিত থাকে, তখন তারা “যত দ্রুত সম্ভব” মনোসংযোগের জন্য পরকীয়ার পথ খুঁজে নেয়।

৩. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

দুবাইয়ের সমাজে কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে, যা প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় বাংলাদেশি পুরুষ বা মহিলারা সমাজের “দেখানো” সম্পর্ক এবং পরিবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চললেও, একাকীত্ব বা দম্পতির মধ্যে সম্পর্কের অস্থিরতা তাদের ভেতর অনুভূতির অভাব সৃষ্টি করতে পারে।

মানসিক বিশ্লেষণ:
সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বাধাগুলোর মধ্যে আটকে গিয়ে কিছু মানুষ পরকীয়ায় নিপতিত হতে পারে। তারা পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক অবস্থানের কারণে একে অপরের প্রতি মনোযোগ দিতে না পারলে, তাদের মধ্যে সম্পর্কের অভাব বাড়তে পারে, যা পরকীয়ার দিকে নিয়ে যায়। এই সমস্যা কিছুটা মানসিক অবস্থা বা সম্পর্কের স্থিতিশীলতা হারানোর কারণে বেড়ে যায়।

৪. সংস্কৃতিগত অমিল

দুবাইয়ে বাংলাদেশি দম্পতিরা অনেক সময় দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠেন—তাদের নিজেদের দেশের এবং আমিরাতের সংস্কৃতি। দুবাইতে কর্মজীবন এবং সামাজিক কাঠামো ভিন্ন, যা অনেক সময় প্রবাসী দম্পতিদের জন্য চাপ এবং বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। এই সংস্কৃতিগত অমিল দম্পতির সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

মানসিক বিশ্লেষণ:
সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে যখন দম্পতিরা নিজেদের সম্পর্কের ভিতরে শূন্যতা অনুভব করেন, তখন তারা অন্য সম্পর্কের দিকে মনোযোগ দেয়। বিশেষত, তাদের সম্পর্ক যখন ধীরে ধীরে শূন্যতা বা আবেগের অভাব অনুভব করে, তখন তারা প্রলোভিত হতে পারে পরকীয়ায় জড়াতে।

৫. অতিরিক্ত স্বাধীনতা এবং লকডাউন

বেশ কিছু সময়, দুবাইতে কাজের জন্য আসা কিছু লোক এখানে এসে অনুভব করেন যে, তাদের সামাজিক এবং পারিবারিক দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে, তারা স্বাধীনতা বা প্রলোভনের কারণে দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অন্য সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন।

মানসিক বিশ্লেষণ:
স্বাধীনতা এবং নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময়ে, কিছু মানুষ অপ্রত্যাশিত পরকীয়ায় জড়িয়ে যেতে পারেন। এখানে আত্মবিশ্বাসের অভাব, সম্পর্কের স্থিতিশীলতার অভাব এবং ব্যক্তিগত সঙ্গীর কাছে প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ার কারণে পরকীয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

দুবাইয়ে পরকীয়া কমানোর উপায়

১. খোলামেলা এবং আন্তরিক আলোচনা

দাম্পত্য সম্পর্কের সমস্যাগুলির প্রতি খোলামেলা এবং সৎ আলোচনা করা জরুরি। দম্পতিরা যদি একে অপরের কাছে তাদের অনুভূতিগুলি শেয়ার করতে পারেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পরস্পরের প্রতি মনোযোগ দেয়, তাহলে তারা অনেক সমস্যা সমাধান করতে পারবেন।

কীভাবে করবেন:

  • দাম্পত্য সম্পর্কের বিষয়ে একে অপরের কাছে নিজের অনুভূতিগুলি শেয়ার করুন।
  • সপ্তাহে একদিন একসঙ্গে সময় কাটানোর এবং সম্পর্কের মধ্যে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করুন।

২. সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ

যতটা সম্ভব, প্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতিরা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এতে করে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক শূন্যতা কমবে এবং সম্পর্কের মধ্যে সঠিক বন্ধন তৈরি হবে।

কীভাবে করবেন:

  • স্থানীয় বাঙালি কমিউনিটির অনুষ্ঠানগুলিতে অংশগ্রহণ করুন।
  • সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে নতুন বন্ধুত্ব গড়ুন এবং পরিবারে সঠিক যোগাযোগ বজায় রাখুন।

৩. মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য

পরকীয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানসিক চাপ এবং সম্পর্কের মধ্যে অবহেলা। সম্পর্কের মধ্যে একে অপরকে মানসিকভাবে সহায়তা এবং সময় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

কীভাবে করবেন:

  • প্রতিদিনের জীবনে একে অপরকে মানসিক সমর্থন দিন।
  • সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং বিশ্বাস বজায় রাখতে সাহায্য করুন।

৪. প্রফেশনাল সহায়তা গ্রহণ করা

যদি সম্পর্কের মধ্যে সমস্যাগুলি মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তবে একজন পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা আপনাকে সম্পর্কের মধ্যে চাপ এবং দ্বন্দ্ব সমাধান করার পথ দেখাতে সাহায্য করতে পারেন।

কীভাবে করবেন:

  • সম্পর্কের মানসিক চাপ নিয়ে পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করুন।
  • সমস্যাগুলি আলোচনা করে সমাধান খোঁজার জন্য থেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।

দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে পরকীয়া এক জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে, সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা এবং চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব। খোলামেলা আলোচনা, পারস্পরিক সহানুভূতি, মানসিক সহায়তা, সামাজিক সম্পর্ক এবং পেশাদার সাহায্য গ্রহণের মাধ্যমে দম্পতিরা এই সমস্যাগুলি সমাধান করতে পারেন এবং সুখী ও সুস্থ দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারেন।

অনলাইনে কাউন্সেলিং সেবার জন্য আমার ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করুন: rajuakon.com/contact

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top